Table of Contents
প্রস্তুতিপর্ব
জার্মানী যাওয়ার প্রস্তুতিপর্ব কেমন ছিল, ভিসা করতেই বা কতদিন লেগেছিল আজ বলব সেইসব পুরনো দিনের কথা। কলকাতা ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছে আমার খুব একটা ছিলনা কোনোদিনই, তবুও ২০১১ সাল থেকে মনে মনে চাইছিলাম একটা পরিবর্তন। তবে সেদিনের সেই যাওয়া যে আমার জীবনে আমূল পরিবর্তনের সূচনা করবে তা বোধ হয় বিধাতা ছাড়া আর কেউ আন্দাজও করেনি।
২০১২ সালের জানুয়ারী মাস থেকেই আভাস পাওয়া গেছিল তবুও সম্পূর্ণ নিশ্চিত হতে হতে আরও দুটো মাস কেটে গেল। ততদিনে অবশ্য আমরা কিছু জরুরী মার্কেটিং সেরে ফেলেছিলাম- ভাল দেখে স্নিকার আর লম্বা-ঝুল মোটা কোট। যাওয়াটাই ভেস্তে গেলে কোটটার কী গতি হত তাই নিয়ে খানিক সংশয় ছিল!
এর আগে আমার বর বেশ কয়েকবার বিদেশে গেছে তবে সবসময়েই একা এবং তা একমাসের বেশী নয়, তাই একবছরের বেশী সময়ের জন্য দু’জনে মিলে বিদেশে গিয়ে থাকব ভেবে বেশ একটা রোমাঞ্চও হচ্ছিল, আবার খানিকটা ভীতিও ছিল।
ভিসা পর্ব
যাই হোক, নির্ধারিত দিনে আলিপুরে জার্মান কনস্যুলেটে পৌঁছে জানলাম শুক্রবার ‘দীর্ঘ-মেয়াদী’ ভিসার ইন্টারভিউ নেওয়া হয় না, সুতরাং আমাদের আবার একদিন যেতে হবে। ওখান থেকেই পরবর্তী সোমবারে যেতে বলে দিল। শুরুতেই এমন বাঁধা পেয়ে মনটা কেমন যেন দমে গেল। শনি -রবি অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটিয়ে সোমবারে সকাল সকাল আবার পৌঁছে গেলাম কনস্যুলেটে। সেদিনের পর্ব অবশ্য মিটল নির্ঝঞ্ঝাটে।
তখন ভিসার তেমন কড়াকড়িও ছিল না, জানলাম ভিসা হাতে পাওয়ার পর আর সময় দেবেনা অফিস, তাই ব্যাগ গুছিয়ে রাখতে হবে আগে থেকেই। এক বৃহস্পতিবারে ভিসা পেলাম আর পরের বৃহস্পতিবারের টিকিট কেটে দিল অফিস থেকেই।
ব্যাগ গোছানো
প্রথম বার বিদেশে যাচ্ছি তাও আবার এত দিনের জন্য কী কী যে সাথে নিয়ে যাব, তা-ই বাছতে বসে পুরো হিমশিম অবস্থা হয়েছিল আমার, এদিকে ব্যাগের ওজন এক কেজিও বেশি হতে দেবে না আমার বর। কী ধরণের পোশাক নিলে ভাল হয় তাও ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। এমন অনেক জামাকাপড় নিয়েছিলাম যেগুলো ফেরত এসেছিল অব্যবহৃত অবস্থাতেই। পরবর্তীকালে, একটা লিস্ট বানিয়ে হিসেব করে ব্যাগ গোছানো অভ্যেস করেছি যাতে সীমিত ওজনের মধ্যেই সমস্ত প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে নিতে পারি।
আমার সেই লিস্ট আপনাদের সাথেও শেয়ার করে রাখছি, যদি কাজে লাগে।
পড়ুন
প্রথম প্লেনে চড়া
সমস্ত আসবাবপত্র ঢাকা দিয়ে, বাড়ি বন্ধ করে বেরোতে বেরোতে বিকেল ৫ টা বেজে গেল। সাড়ে পাঁচটায় চেকিং টাইম, রাত সাড়ে আটটায় এমিরেটসের প্লেন। কলকাতা ছেড়ে বিশেষত বাবা-মাকে ছেড়ে বছর দেড়েকের জন্য চলে যাচ্ছি ভেবে মন বিষণ্ণ তখন।
এয়ারপোর্ট পৌঁছে ট্যাক্সি থেকে জিনিসপত্র নামিয়ে ট্রলিতে চাপালাম। জীবনে প্রথমবার পা রাখলাম এয়ারপোর্টে। সমস্ত চেকিং সেরে, কাগজপত্রে সই সাবুদ সেরে, দুজনের দুটো বড় ট্রলি সুটকেস জমা দিয়ে দিলাম। কেবিন ব্যাগ সাথে গিয়ে বসলাম নির্দিষ্ট গেটের কাছে। বাড়ির সকলের সাথে একবার করে ফোনে কথাও বলে নিলাম।
তখনও আমি আশা করে বসে আছি দূর থেকে আমাদের প্লেনটা দেখতে পাব, তারপর একটা বাসে করে গিয়ে প্লেনের গায়ে লাগানো সিঁড়ি দিয়ে প্লেনে চড়ব। আমার কাছে তখন সবই নতুন। একসময়ে আমাদের প্লেনে ওঠার ঘোষণা করা হল। কেবিন ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বরের পাশে পাশে রওনা দিলাম।
প্লেনের অন্দরে
গালিচা বিছানো সর্পিল পথে চলতে চলতে দেখি প্লেনের দরজায় পৌঁছে গেছি, এমিরেটসের সুবেশা রমণীরা আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন। সিট নম্বর মিলিয়ে বসলাম… জানলার ধারেই আমার সিট, নির্দিষ্ট সময়ে প্লেন নড়ে উঠল, শেষবারের মতো জানলা দিয়ে দেখলাম কলকাতাকে। কত রাস্তাঘাট, কত নদ-নদী পেরিয়ে প্লেন মেঘের উপরে উঠে গেল। চারিদিকে শুধুই ধূসরতা।
জানলা থেকে চোখ সরিয়ে নিলাম, মন দিলাম ভোজনে। অফুরন্ত জুস এবং পানীয়ের ব্যবস্থা ছিল – প্রথমে দিল লেমন জুস, বার কয়েক খেলাম ম্যাঙ্গ জুস… এরপর এল স্নাক্স। সামনের সিটের পিছনে ছোট স্ক্রীন লাগান-পছন্দমত সিনেমা কিম্বা গান চালানো যায়। হেড সেটও দেওয়া ছিল।
প্যাকেটে মোড়া কম্বল বের করে গায়ে দিলাম, কানে চালালাম বাংলা সিনেমা। খানিক পরেই রাতের খাবার দিয়ে গেল। খাওয়া সেরে ঘুম দিলাম। ভারতীয় সময় রাত বারোটা নাগাদ আবার সিট বেল্ট বাঁধার ঘোষণা হল। দুবাইতে প্লেন ল্যান্ড করবে, ঘণ্টা চারেকের অপেক্ষা তারপর আবার সাড়ে ৬ ঘণ্টার জার্নি… গন্তব্য জার্মানির ফ্রাঙ্কফ্রুত এয়ারপোর্ট।
দুবাইতে অবতরণ
স্থানীয় সময় রাত এগারোটা নাগাদ দুবাইতে প্লেন নামল। এবারও প্লেন থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে হল না, সুরঙ্গের ভিতর দিয়েই পৌঁছে গেলাম। শুরু হল চেকিং পর্ব… জুতো খুললাম, হাতের শাঁখা- পলা- চুড়ি যা কিছু ছিল খুলে ট্রেতে রাখলাম। এরপরেও দেখা গেল আমি গেট পার করতে গেলেই সাইরেন বাজছে… অবশেষে আমার কোমরের বেল্ট খুলে সমস্যার সমাধান করা গেল।

এত গয়না পরে আসার কারণ, বিদেশে কোনও দুর্গাপূজা দেখতে গেলে কাজে লাগবে… সেই মতো একটা শাড়িও নিয়ে নিয়েছিলাম।
দীর্ঘ চেকিং পর্ব শেষ করে নির্দিষ্ট গেটের কাছে গিয়ে যখন বসলাম তখন আমার ঘড়িতে ভারতীয় সময় অনুযায়ী রাত দুটো বাজে। দুজনেরই চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসছে। কেবিন ব্যাগ পায়ের কাছে রেখে চেয়ারে বসেই ঘুমিয়ে পড়লাম অচিরেই।
রাত সাড়ে তিনটে নাগাদ ঘুম ভেঙ্গে গেল, দুজনেই চোখে মুখে জল দিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। আর ঘুম এল না। মাথায় তখন অন্য একটা চিন্তা, পরের ফ্লাইটে দুজনের সিট নাকি দু জায়গায় পড়েছে। আমি অনভিজ্ঞ, এত লম্বা জার্নিতে অচেনা মানুষের পাশে বসে যাব কী ভাবে। এই সব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই ভোর হয়ে এল।
ভারতীয় সময় ভোর পৌনে পাঁচটা নাগাদ আবার চেকিং শুরু হল। এবার আর টানেল নয়, বাসে চড়ে গেলাম প্লেনের কাছে। তারপর আমার সেই বহু কাঙ্ক্ষিত সিঁড়ি বেঁয়ে প্লেনে উঠলাম। আবারও সুবেশা রমণীদের অভ্যর্থনা গ্রহণ করে খুঁজে নিলাম নির্দিষ্ট সিট। এবার আর জানলার ধারে নয়, মাঝের সারির আইলের দুটো সিট। আমার বর আমারই পাশে বসেছে দেখে আশ্বস্ত হলাম।
পুরনো ব্লগ
২০০৯ সালে আমাদের বিয়ে হয়েছিল সে গল্পতো আমার পুরনো ব্লগে পড়েছেন আপনারা। না পড়ে থাকলে এখানে লিংক দিয়ে দিলাম- ‘মুক্তবিহঙ্গ’
দেবাঞ্জনা রায়- যমজ সন্তানের মা। হবি: সাঁতার কাটা, বই পড়া ও নিজের জীবনযাপন নিয়ে ব্লগ লেখা। সোশ্যাল মিডিয়াতে নিয়মিত মোটিভেশনাল ব্লগ লিখি। এছাড়া WordPress Developer হিসেবেও ফ্রিল্যান্স করি।এই ওয়েবসাইটটিও আমার নিজের তৈরী। নিচে আমার সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলের লিঙ্ক দেওয়া রইল, পড়ে দেখতে পারেন।

