You are currently viewing আমার সাঁতার। বিগত ১০ বছরের  যাত্রা: শরীরচর্চা, ধৈর্য আর আত্মশক্তির গল্প

আমার সাঁতার। বিগত ১০ বছরের যাত্রা: শরীরচর্চা, ধৈর্য আর আত্মশক্তির গল্প

আমার সাঁতার-বিগত ১০ বছরের যাত্রা: শরীরচর্চা, ধৈর্য আর আত্মশক্তির গল্প

গত দশ বছরে আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ এবং এক নির্ভরযোগ্য অভ্যাসের নাম—সাঁতার। সপ্তাহে পাঁচদিন, প্রতিদিন মাত্র আধঘণ্টা, কিন্তু এই আধঘণ্টাই আমার শরীর, মন এবং জীবনের ভারসাম্য ধরে রাখে। প্রতিদিন ৬০০ মিটার সাঁতার কাটা আজ যেন এক আধ্যাত্মিক অনুশীলন হয়ে উঠেছে আমার কাছে।

সাঁতার এক অসাধারণ শরীরচর্চা

সাঁতার শুরু করেছিলাম শরীরচর্চার জন্য। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এটা হয়ে উঠেছে আমার একান্ত নিজের সঙ্গে নিজের কাটানোর সময়। কারণ জলের মধ্যে যখন সাঁতার কাটি, তখন বাইরের পৃথিবীর শব্দ নেই, ব্যস্ততা নেই, কেবল আমার নিঃশ্বাস, হস্ত-সঞ্চালন আর জলের শব্দ। এখন এটি আমার ধ্যানের জায়গা, যেখান থেকে আমি প্রতিদিন নতুন শক্তি পাই।

শরীরিক উপকারিতার দিক থেকে বললে, সাঁতার পুরো শরীরের জন্য এক অসাধারণ ব্যায়াম। হাঁটু বা জয়েন্টে অতিরিক্ত চাপ না দিয়েই পুরো শরীর একসাথে নড়ে। এছাড়াও দশ বছরের অভ্যাসে আমি বুঝেছি—ফুসফুসের ক্ষমতা বাড়ে, স্ট্যামিনা তৈরি হয়, ঘুম ভালো হয় আর শরীরের ওজনও নিয়ন্ত্রণে থাকে।


সাঁতার আমার আবেগ

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, এই সাঁতারই আমাকে শিখিয়েছে ধৈর্য আর নিয়মিত থাকার শক্তি। অনেক সময় শরীর বা মন কিছুতেই চায় না সাঁতারে যেতে, কিন্তু আমি জানি পুলে ঢুকলেই সব বদলে যাবে। শরীর একসময় গতি পায়, মনও হালকা হয়ে যায়। আর প্রতিদিনের এই ছোট্ট ছোট্ট জয়গুলো আমার আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে।

কোনোদিন হয়ত শরীরটা খারাপ বা কোনোদিন হয়ত মন ভালো নেই —তবুও আমি গিয়েছি। হয়তো পারফরম্যান্স সেদিন দুর্দান্ত ছিল না কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। এই ‘হাল না ছাড়া’ মনোভাব শুধু সাঁতারেই নয়, জীবনের বহু ক্ষেত্রে আমার সহায়ক হয়েছে—হোক সেটা মায়ের ভূমিকায়, কর্মজীবনে কিংবা নিজের পরিচর্যায়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—এই অভ্যাস আমাকে শিখিয়েছে কিভাবে অল্প সময়েও নিজের যত্ন নেওয়া যায়। আধঘণ্টা মাত্র! কিন্তু এই আধঘণ্টা নিজেকে দেওয়া উপহার। বহুবার মনে হয়েছে, “সময় নেই, কাজ অনেক”—কিন্তু আমি জানি, যদি গুরুত্ব দিই, সময় ঠিক বেরিয়ে আসে।


আমার সাঁতার শেখার গল্প

এবার বলি আমার সাঁতার শেখার গল্পটা। আমি কিন্তু সুইমিং পুলের স্বচ্ছ জলে নিয়ম মেনে সাঁতার শিখিনি। শিখেছি পাড়ার পুকুরে। যখন ক্লাস এইটে পড়ি তখন খুব শখ হয়েছিল সাঁতার শেখার। এদিকে বাড়ির কাছাকাছি কোনো সুইমিং পুল ছিল না। তাহলে উপায়! উপায় বের করলেন আমার বাবা। পাড়ার এক কাকুকে নিযুক্ত করলেন আমাদের দুই বোনকে সাঁতার শেখানোর কাজে ।

সুইমিংয়ের নির্দিষ্ট পোশাকের বালাই নেই, চশমা কিংবা টুপিও নেই। ম্যাটাডরের টায়ারের ভিতরে যে টিউব থাকে, ওরকম দুটো টিউব জোগাড় হলো। ওই টিউব কাঁধে নিয়ে পাজামা, টি-শার্ট পরে দু’জনে যেতাম সাঁতার শিখতে। মা পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। দিন দশেকের মধ্যেই আমরা টিউব ছাড়া ভাসতে শিখে গেলাম। হয়ত মাসখানেক লেগেছিল পুরোপুরি সাঁতার কাটতে। চশমা ছিল না তাই মাথা তুলেই সাঁতার কাটতাম।


পুকুরে সাঁতার কাটার অসুবিধা – সুবিধা

আমরা যে পুকুরে সাঁতার শিখেছি সেখানে অনেক মাছ ছিল, তাই জলে একটা আঁশটে গন্ধ বেরোতো। পুকুরপাড়ের সিঁড়িতে বসে কেউ বাসন মাজতেন, কাপড় কাচতেন আবার কেউ সাবান মেখে স্নান করতেন। আর ইঁটের সিঁড়িতে শ্যাওলাতো ছিলই। সেই পিচ্ছিল সিঁড়ি দিয়েই আমরা ওঠানামা করতাম। জলের নীচ দেখার তো প্রশ্নই আসেনা বরং বর্ষাকালে পাশ দিয়ে কখনো সখনো সাপও চলে যেত। তাই সুইমিং পুলের জল কখনো অস্বচ্ছ হয়ে এলে কিংবা জলে পাতা পড়ে থাকলেও আমার কিছু যায় আসে না। আমি একমনে শুধুই এপার ওপার করি।

পুকুরে সাঁতার শেখার ফলে আমরা জানতাম যেকোনো অবস্থায় আমাদের ভেসে থাকতেই হবে। স্বচ্ছ পুলে সাঁতার কাটার মতো ক্লান্ত হলেই পা নামানোর কোনো সুযোগ নেই। পরবর্তীকালে যখন পুলে সাঁতার কাটা শুরু করলাম, তখনও কোনোদিনই দুই পাড়ে ছাড়া পা নামানোর কথা ভাবিনি। এমনকি কারও সাথে ধাক্কা লাগলেও নয়। ক্লান্ত হলে চিৎ সাঁতার কাটি, খুব ধীর গতিতে হাত – পা চালাই কিন্তু কখনো থেমে যাইনা। ইচ্ছে হলে কখনো সখনো স্থির হয়ে ভেসে থাকি আর আকাশে পাখি আর মেঘেদের আনাগোনা পর্যবেক্ষণ করি।

আমার জীবনের নানান ঘটনা জানতে পড়ুন মুক্ত বিহঙ্গ  – আমার ব্লগ । 


সুইমিং পুলে সাঁতারের সুবিধে

পুলে সুইমিংয়ের কস্টিউম আছে, মাথায় রাবারের টুপি আছে আর চোখে চশমা । ফলে চোখে জল ঢোকার ভয় নেই। ট্রেনারের কাছ থেকে দম বাড়াবার কৌশল শিখেছি, হাত-পা চালাবার সঠিক নিয়ম শিখেছি, মাথা ডুবিয়ে সাঁতার কাটা শিখেছি। কিন্ত যে সুবিধেটুকুকে আপন করিনি, তা হলো পুলের গভীরতা আমার উচ্চতার চেয়ে কম জেনেও কখনও পা নামাইনি।


আপনি কীভাবে শরীরচর্চা করেন

এই লেখাটির মাধ্যমে আমি সবার সঙ্গে শুধু আমার অভিজ্ঞতা শেয়ার করলাম তা নয়, একধরনের আহ্বানও জানালাম। আসুন আমরা সকলেই শরীরচর্চার উপর জোর দি। আপনিও যদি এখনো নিজের শরীর, মন আর অভ্যন্তরীণ শান্তির জন্য কিছু শুরু না করে থাকেন—তাহলে নতুন করেও শুরু করতে পারেন। সেটা সাঁতার হোক, হাঁটা হোক, যোগাভ্যাস হোক কিংবা নাচ। নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে আপনি নিজেকে যেমন ভালোবাসতে শিখবেন, তেমনই জীবনের ওপর এক নতুন নিয়ন্ত্রণও আসবে।


আপনি কি সাঁতার শিখতে চান

সাঁতার শেখার কোনো বয়স নেই।যেকোনো বয়সে আপনি শুরু করতে পারেন।এবার যদি আপনি সাঁতার শিখতে চান তাহলে কীভাবে এগোবেন সে সম্পর্কে কয়েকটি জরুরী তথ্য জানিয়ে রাখি।

১. মানসিক প্রস্তুতি নিন

  • জলে ভয় থাকলে তা ধীরে ধীরে কাটানোর চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন, সুইমিং পুলে ট্রেনারের উপস্থিতিতে কোনো বিপদের সম্ভাবনা থাকেনা।

  • মনে রাখতে হবে, সাঁতার শেখা সময়সাপেক্ষ কিন্তু একবার শিখে গেলে দারুন উপকারী।


🟦 ২. সঠিক জায়গা নির্বাচন করুন

  • সুইমিং পুলেই শুরু করা সবচেয়ে নিরাপদ। আপনার কাছাকাছি ভালো সুইমিং পুলের খোঁজ নিন।

  • প্রশিক্ষক আছে কিনা জেনে নিন। অন্যান্য স্টুডেন্টদের থেকে খোঁজ খবর নিয়ে নিন।

  • নিরাপত্তার জন্য লাইফগার্ড বা প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে অনুশীলন করুন।


🟦 ৩. সাঁতার শেখার সরঞ্জাম ব্যবহার করুন

  • সুইমিং কস্টিউম (ভালোভাবে সাঁতার কাটতে)

  • সুইমিং গগলস (চোখে জল ঢোকা রোধ করতে)

  • সুইমিং ক্যাপ (চুল সামলাতে)

  • ফ্লোট বোর্ড (জলে ভেসে থাকার জন্য)


🟦 ৪. শরীরকে জলের সঙ্গে পরিচিত করুন

  • পুলের ধারে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে জলে নামুন।

  • জলের নিচে মুখ ডুবিয়ে শ্বাস নেওয়া এবং ছেড়ে দেওয়ার অভ্যাস করুন।

  • ভেসে থাকার চেষ্টা করুন — চিৎ হয়ে শুয়ে ভেসে থাকাটা শুরু করতে সাহায্য করে।


🟦 ৫. প্রাথমিক স্ট্রোক শিখুন

  • Flutter Kick: পায়ে ছোট ছোট কিক দেয়া

  • Front Crawl (Freestyle): সবচেয়ে সহজ ও জনপ্রিয় স্টাইল

  • Breaststroke: ধীর ও আরামদায়ক স্টাইল

  • প্রথম দিকে ফ্লোট বোর্ড ধরে অনুশীলন করুন


🟦 ৬. নিয়মিত অনুশীলন করুন

  • প্রতিদিন না পারলে সপ্তাহে ৩-৪ দিন সময় দিন

  • ২০-৩০ মিনিট অনুশীলন করাই যথেষ্ট


🟦 ৭. একজন প্রশিক্ষকের সাহায্য নিন (যদি সম্ভব হয়)

  • তারা আপনার ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়ে সঠিকভাবে শেখাতে পারবেন

  • দ্রুত শেখার সম্ভাবনা বাড়ে


🟦 ৮. ধৈর্য ধরে থাকুন

  • প্রথম দিনেই সাঁতার শিখে ফেলা সম্ভব নয়

  • ভয় পেলে থেমে যান, বিশ্রাম নিন, আবার চেষ্টা করুন


সতর্কতা

  • একা কখনো জলে নামবেন না (যতদিন না আপনি শিখতে পারছেন)

  • খালি পেটে বা ভরা পেটে জলে নামবেন না

  • জলে দীর্ঘ সময় দম আটকে রাখবেন না

  • ট্রেনারের কথা মেনে চলবেন

 

আমার জীবনের সেরা সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল সাঁতারকে জীবনের অংশ করে তোলা। দশ বছর পর ফিরে তাকিয়ে আমি গর্বিত নিজের জন্য, নিজের তৈরি নিয়মের প্রতি একাগ্রতা আর এই যাত্রার প্রতিটি মুহূর্তের জন্য।

আপনিও কি এরকম কোনো অভ্যাসকে নিজের জীবনের শক্তি হিসেবে পেয়েছেন? জানাতে ভুলবেন না মন্তব্যে!


এছাড়া আপনাদের আর কোনও প্রশ্ন থাকলে আমার ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামেও সরাসরি মেসেজ করতে পারেন। আমি আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করব উত্তর দেওয়ার। 

আমার সোশ্যাল মিডিয়া লিঙ্ক

ফেসবুক

ইনস্টাগ্রাম

ইউটিউব চ্যানেল

পড়ুন  আমার সম্পর্কে | Author

Rate this post

Discover more from Debanjana Roy-Motherhood Journey

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Debanjana Roy

আমি দেবাঞ্জনা রায়- যমজ সন্তানের মা। আমি ঘুরে বেড়াতে, বই পড়তে এবং সাঁতার কাটতে খুব ভালোবাসি। আর ভালোবাসি নিজের অভিজ্ঞতা লিখে রাখতে। এখানে আমার দুই সন্তানকে বড় করে তোলার নানান অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেব আপনাদের সাথে। পড়ুন টুইন বেবি জার্নাল

Leave a Reply